সোমবার   ২৫ অক্টোবর ২০২১   কার্তিক ৯ ১৪২৮   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
১২০৩

প্রবাসীর ঈদের দাওয়াত...

আশিফ এন্তাজ রবি

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০১৯  

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত

ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি- ৩টা জিনিস সরাসরি আল্লাহ পাকের হাতে। জন্ম, মৃত্যু এবং বিবাহ।

বিদেশে এসে বুঝলাম, ৩ টা নয়, মূলত ৪ টা জিনিস তাঁর হাতে। ‌১. জন্ম ২. মৃত্যু ৩. বিবাহ এবং ৪. ঈদের দাওয়াত।

ঈদের আগের দিন মিতু বললো, চলো কিছু বাজার করে নিয়ে আসি। কাল ঈদ।

আমি অত্যধিক ব্যথিত গলায় বললাম, এইটা কোনো কথা বললা বউ? আমাদের চারপাশে এত বন্ধুবান্ধব- ময় মুরুব্বি। তারা কেউ না কেউ ঈদের দাওয়াত দেবেনই দেবেন। আমাদের বাজার করা মানে তাদেরকে প্রকারান্তে অপমান করা।

আমার কথায় মিতু অত্যন্ত শরমিন্দা হলো। বললো, স্যরি।

আমি আরও কোমল গলায় বললাম, বউ, স্যরি না, তুমি তওবা বলো। ''চলো, বাজার করে আসি''- তোমার এই কথার মধ্যে এক ধরণের অহংকার ছিলো, প্রতিবেশির প্রতি প্রচ্ছন্ন অনাস্থা এই কথার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বলো বউ, তওবা।

মিতু মৃদু স্বরে বললো, তওবা।

আমি বললাম, বউ গো। একটু জোরে তওবা বলো। ক্ষমা সব সময় সবাইকে শুনিয়ে বলতে হয়।

মিতু তার গলার স্বর মাত্র এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে বললো, তওবা।

বর্জ্রপাতের মতো শব্দ হলো।

আমাদের বাসার পিছনে একটা গাছ আছে। সেই গাছে একটা বড়সর কাঠবিড়ালী বাস করে। জন্মসূত্রে এখানকার নাগরিক। ডিসকোভারি চ্যানেলে দেখেছি, কাঠবিড়ালি কখনো গাছ থেকে পড়ে না। মিতুর উচু গলায় তওবা শুনে, সেই কাঠবিড়ালী গাছ থেকে ঠাস পড়ে গেলো।

আমাদের দুজনের অত্যধিক মন খারাপ হলো।

২.

গরুর যেমন দুইটা শিং থাকে, আমারও দুইটা মোবাইল ফোন। একটা অফিসের, আরেকটা ব্যক্তিগত। মিতুরও একটা ফোন আছে । আর বাসায় সবার ব্যবহারের জন্য আছে একটা গণফোন । গুণে দেখলাম, সব মিলিয়ে ফোনের সংখ্যা ৪। মাশআল্লাহ।

আমি চারটা ফোনে চার্জ দিয়ে রাত্রে ঘুমাতে গেলাম। সকাল বেলায় -কে কোন ফোনে কল করবেন, কয়টা দাওয়াত আসে, সেসব দাওয়াত কীভাবে একসাথে ম্যানেজ করবো, কাকে রেখে কাকে নিষেধ করবো, এই রকম নানা চিন্তা-ভাবনায় কোনোক্রমে রাত্রি পার করলাম।

সকাল থেকে ৪ টা ফোন হাতে নিয়ে- ঠায় বসে আছি। কোনো ফোন তো আসে না। ৪টা ফোনের কোনোটাতেই না। এর বদলে দুপুরের দিকে ৪ জন বাসায় এসে উপস্থিত। তারা প্রত্যেকে বেশ উত্তেজিত। ঘটনা কি? ঘটনা অতি ভয়াবহ। এরা ৪ জনই ঈদের দাওয়াত পান নি। খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, ঈদের দাওয়াত আমিও পাই নি। আমাদের দুখের সাথে সংহিত জানাতে এরা এসেছেন।

অতিথি বলে কথা। ঘরে নিয়ে বসালাম। এই চারজনের মধ্যে যিনি সবচেয়ে সিনিয়র, তিনি ঘোষণা দিলেন, আমরা কি ফকির নাকি? দাওয়াত পাই নাই তো কী হইছে? আমরা কী ভাইসা আইছি? চলো হোটেলে গিয়ে জমিয়ে মাংস খাবো।

বাসার অদূরে একটা বাংলা খাবারের রেস্তরা আছে। দুটি গাড়ি ভর্তি মানুষ আর পেট ভর্তি ক্ষুধা নিয়ে - সেখানে ছুটলাম। সেথায় গিয়ে যা ঘটলো, সেটা গ্রীক ট্রাজেডির চাইতে সামান্য বেদনাবিধুর।

রেস্তরা খোলা, খাবারও দিচ্ছে। কিন্তু সেটা কেবল প্রি অর্ডারের। কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে যারা অর্ডার করেছেন, তাদের খাবার দেয়া হচ্ছে। নো গেস্ট এলাউড।

ছোটবেলা থেকে আমার অভ্যাস হচ্ছে, আন্দোলন করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আমাদের পুরো টিম বললো, ভাই আপনি একটা প্রতিবাদী, জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। ফাজলামি নাকি।

লোকজন আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো। আমার গায়ে পাঞ্জাবি, উচু পেট । চারিদিক থেকে মোবাইলের ক্যামেরা তাক করা। পুরো নেতৃত্ববান্ধব পরিবেশ। গলার ভেতর বিপ্লবের জোয়ার আসতে তেমন সময় লাগলো না।

কিন্তু পেটে ক্ষুধা থাকলে যা হয়, কথা বলতে গিয়ে দেখলাম, গলা দিয়ে কোনো সাউন্ড বের হচ্ছে না। কোনক্রমে বললাম, ভাই এগুলো ঠিক না।

এইটুকু বলেই আমার গলা ধরে আসলো।

প্রবাসে বাঙালিরা কমপক্ষে দুইভাগে বিভক্ত। এমনকি রেষ্টুরেন্টের খাওয়ার ব্যাপারে দ্বিদলীয় নীতি আছে। কাজেই এই রেষ্টুরেন্টের একটা রাইভাল রেষ্টুরেন্টও আছে। আমরা প্রতিবাদ সভা থেকে ঘোষণা দিলাম, এখন থেকে আমরা এই রেষ্টুরেন্টে আর আসবো না। আমরা অন্যটাতে চলে যাচ্ছি। কেয়ামত অবধি সেখানেই খাবো। আমরা মরে গেলে আমাদের সন্তানেরা ওই হোটেলে খাবে, দরকার হলে বাসন মাজবে। তবু এই হোটেলে আর না।

রাগের মাথায় এই বক্তব্য দেয়া -মোটেও সমীচীন কাজ হয়নি। দ্বিতীয় রেস্তরায় যাবার পর দেখা হলো, ওটার ঝাঁপ ফেলা। ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই ওটা বন্ধ। কবে খুলবে, কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারলো না।

এরপর সবাই যে যার মোবাইল ফোন গুঁতাতে লাগলো। গুগল করে দেখা গেলো, দুই ঘন্টা দূরে একটা পাকিস্তানি রেস্তরা আছে। সেটা আজ খোলা। এবং বিনা অ্যাপয়েন্টে অতিথিরা যেতে পারে।

প্রচুর তেল পুড়িয়ে এবং ধোঁয়া উড়িয়ে - আমরা সেখানে ছুটলাম।

পুরো দোকানে একটা মাছিও নেই। বিশাল এক হাড়ির তলায় কালচে রঙের একটা তরল পদার্থ। বস্তুটার নাম নেহারি। জিজ্ঞেস করলাম, কীসের নেহারি?

দোকানের মালিক একজন খাস পাঠান। তিনি বিনয়ে হেসে জানালেন, খাসির নেহারি।

হাড়ির মধ্যে বিশাল একটা কাঠের খৃুন্তি। বস্তুটার ঘনত্ব পরীক্ষা করার জন্য আমি সেই হাতা দিয়ে ঝোলটা নাড়ার চেষ্টা করলাম।

পাঠান মালিক হা হা করে উঠলেন। বললেন, ওটা কাঠের খুন্তি নয়, ওটাই মাংসের হাড়।

বলে কি! খাসির হাড় কীভাবে এত লম্বা হয়?

তখন তিনি একটু আমতা আমতা করে বললো, এখানে কেবল খাসির হাড় নয়, দু একটা উটের হাড়ও আছে। অরিজিনাল সৌদি উট।

এতদিন মিক্সড ভেজিটেবলের নাম শুনেছি। এই প্রথম মিক্সড নেহারির সামনে জীবন্ত দাঁড়িয়ে আছি। আবেগে আবারও আমার গলা ধরে এলো।

মনির ভাই চোখ রাঙিয়ে বললেন, এটা কি ফাজলামি পাইছেন? উটের হাড় এত লম্বা হয়? আমরা কি আর উট দেখি নাই। এটা কনফার্ম জিরাফ।

এই কথা বলার অধিকার মনির ভাইয়ের আছে। কেননা উনি কিছুদিন আগে সৌদি ঘুরে এসেছেন। উটের সাথে ছবিও তুলেছেন। সেই ছবি মোবাইল থেকে বের করে সবাইকে দেখালেন। আমরা চোখের আন্দাজে মেপে দেখলাম, উটের হাড় আসলেই এত লম্বা হয় না।

আমার ছোট কন্যা মতামত দিলো, মে বি ইটস ডাইনোসোর।

এমন খিদা লাগছে, ডাইনোসোর কেন, হাতির সিনার মাংস পেলেও খেয়ে ফেলবো। কাজেই আমরা বাটি নিয়ে বসে গেলাম।

জিনিসটাতে চুমুক দিতেই পুরো পেট কেঁদে উঠলো। একদম বাসি। মিশরের শেষ সম্রাট মৃত্যুর আগে নেহারি খেতে চেয়েছিলেন। তার জন্য বেশ আয়োজন করে নেহারি রান্নাও হয়েছিলো। কিন্তু বেচারা খেয়ে যেতে পারেন নি। তার আগেই তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন। সেই নেহারি এত শতাব্দী ধরে ফ্রিজে রেখে দেয়া হয়েছিলো। আজ আমাদেরকে গছিয়ে দেয়া হচ্ছে। হায় কপাল।

কোনো রকমে নেহারি গলঃধকরণ করে বাসায় ফিরলাম।

বাসায় ফেরার পর অমি ওরফে স্নিগ্ধা চোখমুখ কঠিন করে বললো, ভাঁইয়া, আপনাদের বেডরুমটা খুলে দেন।

আমি বললাম, কেন ?

সে চোখমুখ আরও কঠিন করে বললো, আমার অফিস থেকে ফোন আসবে। আমার একটু নিরালায় কথা বলা দরকার।

তাকে শোবার ঘরের দরজা খুলে দেয়া হলো। দরাম করে সে দরজা লাগিয়ে দিলো। একটু পর, সেই রুম থেকে হাউমাউ করে কান্নার শব্দ আসতে লাগলো। আমাদের জানের টুকরো, আমাদের বন্ধু, আমাদের বোন অমি কাঁদছে।

এটা দেখে লাভলী বেগম ক্ষেপে গেলো। ঈদের দিন কেন কান্নাকাটি হবে। সামান্য খাবারের জন্য আমরা কাঁদবো। আমি কোনো কান্নাকাটির মধ্যে নাই। কথাটা বলে সে নিজেই ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতে বসে গেলো।

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হৃদয়ের মানুষ এলেন ভাই। এই দুই নারীর কান্না দেখে, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, কান্দিস না রে বইন, একদিন আমাদেরও ঈদ আইবো।

আমার মেজাজ গেলো খিচড়ে। এদের মাথামুথা পুরা গেছে। আমাকে ধরে কাঁদেন ঠিক আছে, কিন্তু আমি বোন হলাম কোন হিসাবে?

যাই হোক। পুরো বাসায় নরক গুলজার অবস্থা। কান্নাকাটির চোটে এলাকার সব কাঠ বিড়ালী গাছ থেকে খসে খসে পড়ছে। বাচ্চারা অবাক হয়ে বড়দের দিকে তাকিয়ে আছে।

কান্নাকাটির ধকলটা একটু কমতেই --বাসায় আসলেন তানিম ভাই। উনার মুখে অপরাধীর হাসি। উনি সদ্য একটা বাসা থেকে ঈদের দাওয়াত খেয়ে এসেছেন। উনাকে দেখে আমাদের অশান্ত হৃদয় আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। আমরা চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইলাম।

মোস্তফা তানিম হচ্ছেন- আমার দেখা এই পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম মানুষ। প্রথমজন আমার বাবা। তানিম ভাই নিরীহ গোবেচারা মানুষ। উনি আমাদের কষ্টটা লাঘব করার জন্য বললেন, এক বাসায় গিয়েছিলাম। ওরা কাচ্চি বিরাণি করেছে। খেতে একদমই ভালো হয়নি।

খুবই সুখের খবর। কিন্তু এই খবর শোনামাত্র আমাদের প্রত্যেকের মাথায় কেন জানি-আগুন জ্বলে উঠলো। আমরা এমনই উত্তেজিত হয়ে উঠলাম, পারলে তখনই উনাকে কুরবানি দিয়ে রান্না করে খেয়ে ফেলি।

আমাদের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় উনি আহত হলেন। আমতা আমতা করে বললেন, বিরানি ভালো হয় নাই, তাতেই আপনাদের এই অবস্থা। ভালো হইলে না জানি কি করতেন ...

এই কথার পর পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো, যা ঘটলো- সেটি বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নাই।

৪.

শেষমেষ ঠিক হলো- আমরা খিঁচুরি রাধবো। সাথে ডিম ভাজি। পুরো টিমের সেকী উৎসাহ। আহা মিতু, করছো কি? আরেকটু তেল দাও। ডিমের আসল মজা তেলে। ডিমে তো চর্বি নাই। একটু শুকনো মরিচের গুড়ো দেবে নাকি, একটু ঝাল হবে তাহলে।

রান্না শেষ করে মহা উৎসাহে খেতে বসেছি, তখনই প্রত্যেকের মোবাইলে ফোন আসা শুরু হলো। না, ঈদের দাওয়াতের ফোন না। ঢাকায় ঈদ শুরু হয়েছে। কাজেই দেশ থেকে আমাদের মাতাগণ ফোন দিয়েছেন। বাবা, নামাজ পড়ছো? কী খাইতেছো?

আমি ডিম ভাজা চাবাতে চাবাতে বললাম, খাসির রেজালা, পোলাও, একটু বিরাণীও আছে।

মনির ভাই তাঁর মাকে বলছেন, সারা দিন খেতে খেতে টায়ার্ড। এত মাংস খেলাম আজকে। প্রেশার বাড়ে কিনা, এইটা নিয়া চিন্তায় আছি।

এলেন ভাই সবার চেয়ে এগিয়ে। তিনি মাংসল খাবারের যে লম্বা ফিরিস্তি দিলেন, সেটি শুনেই আমাদের সকলের পেট ভরে গেলো।

যখন ছোট ছিলাম, মা আমাদের সবচেয়ে ভালো জিনিসটা পাতে তুলে দিতেন। আমরা সব চেটেপুটে খেয়ে বলতাম, মা তুমি খেলে না?

মা আমাদের মিথ্যে বলতেন, বাবা, আমি তো আগেই খেয়েছি। তুমি শান্তি মতো খাও।

আজ বহু বছর পর, আমরা এতগুলো প্রবাসী সন্তান , একই ভঙ্গিতে মিথ্যে বলে- মায়ের ঋণ শোধ করলাম।

আলহামদুলিল্লাহ!!!

[ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত]

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর