বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮   ২৪ রমজান ১৪৪২

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
১০৬৭

হজের আদব

শয়তান মারতে গিয়ে নিজেই যদি...

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

হজের কিছু আদব-কায়দা আছে যা ভালো কিছু লেখকের হজ বিষয়ক বইতে আছে। হজের সময় নিষ্কাম মনে থাকা, নামাজ-কালাম, তাওয়াফ (বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবাঘর) করা, জজজমের পানি পান করা, কংকর নিক্ষেপের সময় শালীনতা বজায় রাখাসহ কায়মোনোচিত্তে ইবাদত বন্দেগিতে মনোনিবেশ করার কথা বারবার বলা হয়েছে। হজ শেষে আকিদা বা আচার আচরণের পরিবর্তনকে হজ কবুলের শর্ত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কাবাঘর থেকে খানিকটা দূরেই বিখ্যাত কবুতর চত্বর। এখানে বিপুল সংখ্যক কবুতর আছে যারা এই চত্বরে হজযাত্রীদের ছিটিয়ে দেওয়া দানা খেয়ে থাকে। নামাজের সময় চত্বরটিতে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। হজ শেষে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করেন হজযাত্রীরা। নামাজ আদায় করেন কাবা চত্বরে।

তাওয়াফের সময় চাপাচাপি ও হুড়োহুড়ি এক সাধারণ বিষয়। তবে সেটা তাওয়াফকালে পরস্পরকে হাতের গুঁতো দিয়ে ঠেলে দেওয়া, বৃদ্ধ ও নারীদের পেছন থেকে ঠেলা দেওয়া, পা দিয়ে পা চেপে দেওয়া, ঊচ্চস্বরে কান্নাকাটি ও দোওয়া পড়া, ঊচ্চস্বরে ঝাঁক ধরে দোওয়া পড়া ইত্যাদি ঘটনা বেশ পীড়াদায়ক। তাওয়াফও একটি ইবাদত যা মহান আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের জন্যই করা হয়। কিন্তু একজন হজযাত্রীর আচরণের কারণে যখন আরেকজন আঘাতপ্রাপ্ত হন তখন এর ফল দাঁড়াবে কি? প্রবীণ ও বৃদ্ধরা প্রায়ই এখানে সমস্যায় পড়েন। কষ্ট পান বেশ। নিশ্চয় তাওয়াফকাল শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়। অন্যকে সহযোগিতা করার মধ্যেই কল্যাণ। কিন্তু তাওয়াফকালে এটা ক’জন মনে রাখেন তা নিয়ে আমার সংশয় বেড়েছে। তাহলে হজের শিক্ষাটা কীভাবে নিলাম?

একই দৃশ্য সাফা ও মারওয়া পথে সাই (দৌড়) দেওয়ার সময়ও দেখা যায়। তাওয়াফ ও সাই শেষে কাবা চত্বরে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে হয়। অনেকেই এই নামাজ দীর্ঘ করেন। এতে আরও হাজারজনের অসুবিধা হয়। অনেকেই দীর্ঘক্ষণ ধরে দোওয়া করেন। এতো সময় দোওয়া করলে আরেকজন বঞ্চিত হন। তাওয়াফকালে হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর ছুঁতে যে প্রতিযোগিতা দেখা যায় তাকে এক ধরণের যুদ্ধই বলা যায়। এতে কতোজন যে আঘাতপ্রাপ্ত হন তা বলাই বাহুল্য। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ মহান আল্লাহর প্রতি প্রার্থনায় মনোযোগ কীভাবে দিতে পারেন যেখানে নিজের জীবন বাঁচাতেই তাকে সব মনোযোগ দিতে হয়! অনেকেই বলেন, ব্যবস্থাটাতে শৃঙ্খলা থাকা জরুরি। যাতে সবাই এই সুযোগটা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পেতে পারেন। 

কাবা চত্বরে একজন নামাজে সিজদা দিয়েছেন তার মাথার ওপর পা দিয়ে অনেকেই অবলীলায় চলে যাচ্ছেন। আমাদের মোয়াল্লেম বললেন, এখানে এটাই নিয়ম। তা’হলে নামাজের কি হবে? কেউ সামনে দিয়ে গেলে তো নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে- এটা নামাজের শর্তে বলাই আছে। মানুষ এতো বেশি যে এখানে নির্বিঘ্ন পরিবেশে নামাজ আদায় করার সময় ও জায়গা নেই- এটা ঠিক। ব্যবস্থাটায় শৃঙ্খলা রাখার উদ্যোগ নেওয়া যায় বলে অনেকে মনে করেন। কাবার ভেতরে ও বাইরে জমজমের পানির বিপুল যোগান আছে। ছোট ছোট প্লাস্টিকের গ্লাস আছে। পানি খেয়ে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু অনেকেই ব্যাগে ভরে আনা একাধিক বোতলে পানি ভরেন অনেকসময় ধরে। এতে অনেক মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়। কাবাঘরের সেবায় নিয়োজিত প্রহরী ও স্বেচ্ছাসেবিরা বারবার নিষেধ করলেও এটা হাজি সাহেবরা কানে তোলেন না। হাজারজনের অসুবিধা করে তিনি নিজে জমজমের পানি দিয়ে ব্যাগ ভর্তি করতেই ব্যস্ত। জমজমের পানি খাওয়া নিয়ে হুড়োহুড়ি দেখে যে কারো মনে হতে পারে- এই এক গ্লাস পানি পান করেই তিনি বেহেশত কনফার্ম করে ফেলতে চান। আর যেন কোন কাজ নেই।

আমার সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষন থেকে যা বুঝি তাতে হজ্বে আনার আগে মোয়াল্লেমরা হজযাত্রীদের সব বিষয়ে সম্যক ধারণা দেন না। বাংলাদেশ থেকে আসা হজযাত্রীদের ৯০ ভাগই গ্রাম থেকে আসেন। মোয়াল্লেমরা হাজি পাকড়াও (হাজী পটানোও বলা যেতে পারে) অভিযানের সময় হজের বিধিবদ্ধ নিয়মের বাইরে মানুষকে এমন সব লোভনীয় ধারণা দেন যা মক্কায় এসে হজযাত্রীরা সেইসবই করতে থাকেন যাতে অন্যের অসুবিধা হয় এবং এসব কাজের মাধ্যমে হজ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।

জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের সময়ও একই ধরণের হুড়োহুড়ি ও প্রতিযোগিতায় অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হন। অনেক হজযাত্রীর সেদিকে আদৌ কোনো মনোযোগ থাকে না। মোয়াল্লেম তাকে বলে দিয়েছেন, যে কোনো মুল্যে ভীড়ের মধ্যেই তাকে কঙ্কর নিক্ষেপ করতেই হবে। করাটাও জরুরি হজের জন্য। কিন্তু আরেকজন প্রবীণ বৃদ্ধ নারী কিংবা দুর্বল মানুষকে হাতের শক্তি দিয়ে পেছনে ফেলে নিজে এগিয়ে গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা মানেই হজ অভিযান জয় করা নয়। সহনীয় মনোভাবে কাজটি করার কথা বলা হয়েছে। শয়তান মারতে গিয়ে নিজেই যদি আরেকজনের অসুবিধার কারণ হয়ে যান, তাহলে হজের শিক্ষাটা কি বা হজের আবদ কায়দার কি হবে?
[আনু মুহাম্মদ: লেখক ও সাংবাদিক]
প্রবাসখবর.কম/এসএন  

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর