বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮   ২৪ রমজান ১৪৪২

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
৮৯৩

খুব মনে পড়ে তারেক ভাই...

সোহেল রহমান

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০১৯  

তারেক মাসুদ                         -ফাইল ফটো

তারেক মাসুদ -ফাইল ফটো

সিলেটে তখন তারেক ভাইয়ের ছবি অন্তরযাত্রা চলছে। ছবি নিয়ে প্রথম আলোয় দুকলম লিখি। রিকাবি বাজারের অডিটোরিয়ামে দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। ভিড় ঠেলে হঠাৎ দেখি তারেক ভাই আমার কাছে এলেন। "কনগ্রেচুলেশন ইয়াং ম্যান। চমৎকার লিখেছ।" আমি পুরাই হতবম্ব। বুঝছিলাম না, এটা কল্পনা নাকি বাস্তব! তারেক মাসুদ, বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, আমার মত একটা ইউনিভারসিটি পড়ুয়া ছেলেকে হাত বাড়িয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে! 

ছবি শুরুর আগে দর্শকের জন্য কথা বললেন তারেক ভাই, দেখি তখনও আমার নাম উচ্চারণ করে লেখার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। কে দেখে তখন ভেতরের উথাল পাতাল খুশির বন্যা। সেদিনই মনে হয় ভেতরে ভেতরে চলচ্চিত্রের বীজ বপন শুরু হয়েছিলো।

তারেক ভাইয়ের সাথে তারপর দীর্ঘ পথচলা। শাহজালাল ইউনিভার্সিটির পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় ফিরি সাংবাদিকতার চাকরি নিয়ে। যদিও জীবন নির্বাহের জন্য সাংবাদিকতার চাকরি, কিন্তু মনে প্রাণে কেবলই ফিল্ম বানানোর স্বপ্ন। একদিন এক সন্ধ্যেয় তারেক ভাইয়ের ফোন, "সোহেল, আমাদের নতুন ছবি কাগজের ফুল এর কাজ শুরু করব। আমি আর ক্যাথরিন তোমার কথা ভাবতেছি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। খুশি হবো, যদি তুমি কাজ করতে পারো।" আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। একই সাথে একটা ভয়, একটা সংকোচ। আমি কি পারবো! কিছুই তো জানি না আসলে ফিল্ম নিয়ে। শেষমেশ সাংবাদিকতার চাকরিটার পাশাপাশি তারেক ভাইয়ের সাথেও কাজ শুরু করে দিলাম। 

ফার্মগেটের মনিপুরিপাড়ার বাসা অথবা মোহাম্মদপুরের অফিস। ফিল্ম ওয়ার্কশপ, ফিল্ম বাহাস, শুটিং, স্ক্রিপ্ট পড়া। নাহিদ ভাই, প্রসুন ভাই, মৌ আপু, মাহমুদ ভাই, শহিদ, সাজ্জাদ, বাব্লু, মুস্তাফিজ, ওয়াসিম আরও কত নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। একটা নতুন জগত আমার। 

রানওয়ের প্রদর্শনীর জন্য তারেক ভাইয়ের সাথে ছুটে চলা কখনো ময়মনসিংহ, কখনো সাভার। মাইক্রোবাসে বসে তারেক ভাইয়ের ফিল্ম নিয়ে কথা বলা যেন একেকটা মাস্টার ক্লাস। কোন ক্লান্তি নাই। দরাজ গলায় বলে যাচ্ছেন কত গল্প, কত হাজার কথা।

জানিনা এর আগে অত চিৎকার করে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম কিনা! আমার কলিগ, সাংবাদিক রবাব ভাই যখন ফোন করে তারেক ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা জানালেন। সব কিছু থেমে গেল মুহূর্তেই। পৃথিবীটা আচানক ভেঙ্গে পরল দুমড়ে মুষড়ে।

তারপর তারেক ভাইয়ের প্রতিনিধি হয়ে রানওয়ে ও নরসুন্দরের প্রদর্শনী করতে শহিদ আর বাব্লুর সাথে ছুটে গেছি নেত্রকোনা, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর। তারেক ভাই নিয়ে আমাকে কথা বলতে হতো, কথা শেষে ক্যাথরিন কল দিত আমার ফোনে। দর্শকের উদ্দেশ্যে ক্যাথরিন কথা বলত। লাউড স্পিকারে তা শুনাতাম সবাইকে।
কতটা বছর তারেক ভাই ছাড়া। কত গল্প জমা হয়ে গেছে তারেক ভাইকে বলার। একদিন ছোট মাইক্রোবাসে বসে যে প্রাণের মানুষটি স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের, তাঁরই দেখানো সে স্বপ্নের আলোয় হেঁটে চলেছি পৃথিবীর নানা প্রান্ত। নানা দেশ। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছি ভালো চলচ্চিত্র বানানোর। তেমন কিছুই করতে পারিনি এখনো। তবে একটা প্রতিজ্ঞা আছে। রিকাবি বাজারের অডিটোরিয়ামে দাঁড়িয়ে যেভাবে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন তারেক ভাই, একদিন আমিও বিশ্ব চলচ্চিত্রের কোন এক মঞ্চে উঠে ধন্যবাদ জানাবো, দুনিয়াকে বলব তারেক মাসুদের কথা। স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণার কথা।
খুব মনে পড়ে তারেক ভাই। আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক। আত্মাকে শান্তি দিক। ভালো থাকুন।
[সোহেল রহমান: পর্তুগাল প্রবাসী তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা পিএইচডি গবেষক]
প্রবাসখবর.কম/কেআর

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর