বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮   ২৪ রমজান ১৪৪২

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
৬১৮

কৃতজ্ঞতা জানানোর মাঝে ভালোলাগা অনুভব

এহছান লেনিন

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০১৯  

যারা আমাকে চেনেন, যাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমার বন্ধু, সহপাঠী, শুভাকাঙ্ক্ষি, তারা অন্তত বিশ্বাস করবেন বিদেশে আমি ভাগ্য অন্বেষণে আসিনি! অনেক অনেক মোহ, ভালোবাসা ত্যাগ করার সাহস নিয়েই একটা ভিন্ন পরিসরে, ভিন্ন পরিচয়কে গ্রহণ করার সাহস দেখিয়েছি! সেই অবস্থান থেকে আমাকে নিয়ে আমি সত্যিই বেশ অহং বোধ করি! 

আর সেই অহংকারের যারা ভিত্তি রচনা করে দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা কিংবা ঋণ শোধের বাসনা প্রকাশ করা অনেকের কাছে ন্যূনতম ‘কার্টেসি’ হতে পারে, আমার কাছে অবশ্য করণীয়।  বিনয়ের সঙ্গে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই আজ।

গত আড়াই বছরের বেশি সময় যে মানুষটা আমাকে এই ভিনদেশে আগলে রেখেছেন, মাথার উপর অভিভাবকত্বের ছাতা মেলে ধরেছেন, ভিন্ন আদর্শের হয়েও নানা সময়ে আমার কথাই মেনে নিয়েছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোর ছাত্রনেতা, সেই Zaman ভাইয়ের প্রতি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানানোর মাঝে আজ কেমন যেন ভালোলাগা অনুভব করছে। 

গ্র্যাজুয়েশন সেরেমনিতে তিনজন অভিভাবককে আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ থাকলেও আমি শুধু এই মানুষটির নাম লিখে দিতে পেরে যারপরনাই তৃপ্তি পেয়েছিলাম। 

এখনও মনে পড়ে- হেলসিংকির আলিসান ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়ে যখন বলেছিলেন- যতদিন খুশি থাকেন, যা দরকার শুধু আমাকে বলবেন।  দেশি খাবারের জন্য প্রাণ যখন যায় যায়, সুইডেনে বসে হেলসিংকিতে রান্না করিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। কতোটা ভালোবাসা, স্নেহ থাকলে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের ইচ্ছা পূরণে পাশে থাকেন তা আমার জানা নেই।  এটা তো খুবই নগন্য বিষয়, পেয়েছি আরও অনেক অনেক, সেই কৃতজ্ঞতার ফর্দ হয়তো লিখেও শেষ করা যাবে না!

যাদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় আমার এখানে আসা, আমার বন্ধুবর বটবৃক্ষ Ashok’দার কথা কীভাবে ভুলি।  বিদেশে আসার পর অনেকেই হয়তো তাদের ফোনবুক থেকে আমার নম্বরটা মুছে দিয়েছেন, ভেবেছেন সাংবাদিক লেনিন গত হয়েছে, ইহকালে এই বান্দাকে আর দরকার পড়বে না! আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়তো এই মানুষটা এখনও তার ফোনবুকে কিংবা মস্তিষ্কে আমার নম্বরটা রেখে দিয়েছেন। মনে আছে, রবির এই বড় কর্মকর্তা মাঝে মাঝেই ফোন দিয়ে বলতেন- ’এহেছান ভাই তাড়াতাড়ি আপনার ওভেনটা (পড়তে হবে প্রাইভেট কার, এসি নষ্ট) লইয়া আমার অফিসের সামনে চইলা আসেন, কথা আছে।’ তোমাগো কথা ভুলি নাইরে বটগাছ। মনে পড়ে। প্রচণ্ড মিস করি। 

আমার খুব প্রিয় একটা ছোটভাই আছে। Sanjoy বিশ্বাস। আমি যোগাযোগের বাইরে চলে গেলেই তার একটা এসএমএস মোবাইলে এসে ঢুকে- ‘ভাই হারাইয়া যাইয়েন না।’ এই ছোট ভাইটা আমার যেকোনো দুর্যোগে অভিভাবকের মতো পাশে থেকেছে। বিনিময়ে কিছুই হয়তো করতে পারিনি। তাও বলবো- লেনিনরা কিন্তু হারাইয়া যাওয়ার মানুষ না ছোটভাই। সময় মতো জেগে ওঠার মানুষ। ছোটভাই গোয়েন্দা কর্মকর্তা Sharder Jarjish জেরিরা যখন আমার সঙ্গে একরাত আড্ডার জন্য অপেক্ষার কথা লিখে, সত্যি আপ্লুত হই। মনে হয় আমার গত হওয়া সময়ের সবকিছু এখনও মলিন হয়নি। 

আমার চারটা প্রিয় বন্ধুর কাছে আমি প্রচণ্ড কৃতজ্ঞ। ঋণী। এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে এসে Mushtaq Ahmed Sagar যখন বুঝলো সারাদিন আমাকে সময় দিতে দিতে আমাকে দেওয়ার মতো কিছুই কিনতে পারেনি, পরনে থাকা বেল্ট খুলে দিয়ে বলেছিল- দোস্ত কিছুইতো দিতে পারলাম না, এইটা রাখ, অরিজিনাল লেদারের। আমার খুব প্রিয়। সাগর, তোর কথা আমি সারাজীবনেও ভুলবো না। তোরা ছিলি বলেই...। লন্ডন প্রবাসী বন্ধু Shahin- এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। অথবা এমন সৌজন্য রক্ষা তাকে বরং অপমানিতই করবে! অসম্ভব ভালোবাসি বন্ধু। কাজীপাড়ার হতাশার দিনগুলোই বরং এখন আমাকে টানে। আমার স্কুলবন্ধু Rezwanul, অস্ট্রেলিয়ার নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক; ও কতভাবে যে আমার পাশে থেকেছে তা আর বলতে চাই না। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমার বন্ধু Suhel সব সময়ই আমাকে আগলে রেখেছে। হয়তো তোদের এই ভালোবাসার যোগ্যতা আমি রাখি না। 

আসলে লিখতে গেলে এমন অসংখ্য নাম চলে আসবে যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরও ভালোবাসা, স্নেহ, মমতাই আমার শক্তি। সত্যি কথা বলতে গেলে আমি এই একটা বিষয়ে খুবই ভাগ্যবান। এই ভালোবাসার অন্বেষণে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।  মন্দ কী!
[এহছান লেনিন: ফিনল্যান্ড প্রবাসী, সাংবাদিক, অউলু বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, একজন সুখী মানুষ হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ব করেন]

প্রবাসখবর.কম/এসএস

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর