রোববার   ১৬ মে ২০২১   জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৮   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
৫২৪০

কুয়েতে ২ ভিসা দালালের যাবজ্জীবন, বাংলাদেশি বারেকের ৩ বছর জেল

কুয়েত সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

প্রবাসী শ্রমিক (বামে) ও আব্দুল বারেক (ডানে)         -ফাইল ফটো

প্রবাসী শ্রমিক (বামে) ও আব্দুল বারেক (ডানে) -ফাইল ফটো

৪০০ প্রবাসীর কাছে প্রতিটি ভিসা তারা বিক্রি করেছিল দেড় হাজার কুয়েতি দিনার (কেডি) করে। আজকের বাজার দর হিসাবে বাংলাদেশি টাকায় দেড় হাজার কেডিতে (১ কেডি= ২৭৮.০৫ টাকা) হয় চার লাখ ১৭ হাজার টাকার কিছু বেশি। এই অপরাধে একজন কুয়েতি নাগরিক ও একজন মিশরিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে কুয়েতের একটি ফৌজদারি আদালত।

বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) কুয়েতি দৈনিক আরব টাইমস জানায়, একই অপরাধে সহযোগিতার দায়ে একজন সৌদি নাগরিক, দুইজন মিশরি ও একজন সিরীয়কে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের সবার বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ আনা হযেছে। এছাড়া অপর এক অভিযোগের সূত্রে মামলায় বাংলাদেশি ভিসা- কালোবাজারি আব্দুল বারেককে ৩ বছরের কারাদণ্ড ৩০০০ কেডি জরিমানা করেছে কুয়েতর অপর এক আদালত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বারেক এখন বাংলাদেশে আছেন- কুয়েত প্রবেশ করা মাত্র তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হবে।

এই খবর জানার পর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করা যায়। একরাম আলী বাবু নামে একজন প্রবাসী মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে কিছু চোর ধরা শুরু করেছে, ডাকাতদের এখনো ধরছে না। কুয়েতে এই বাটপারদের ধরা হউক। তাহলে বাংলাদেশের সুনাম হবে। তবে আরেকটি সূত্র দাবি করেন, এই তথ্য সঠিক নয়, অপপ্রচার। ওই সূত্র মতে, বারেক একজন জেনুইন জনশক্তি ব্যবসায়ী। সম্প্রতি বাংলাদেশে এক মানববন্ধনে কুয়েত দূতাবাসের কল্যাণ সহকারীদের অর্থাৎ মন্দুবদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান তাদের দ্বারা সর্বস্বান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ কুয়েত ফেরতরা। আব্দুল বারেক ওই মানববন্ধন আয়োজনে ভূমিকা রাখেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে মন্দুবরা তার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার করছে।

এদিকে, কুয়েতি মিডিয়া জানায়, মিশরিদের সঙ্গে ভিসা বাণিজ্যের ঘটনায় কুয়েতি পুলিশ ফৌজদারি কর্মকাণ্ড শুরু করে যখন কয়েক ডজন প্রবাসী মিশরি শ্রমিক ভিসা ব্যবসায়ী আদম পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। একই সময়ে মিশরি কর্তৃপক্ষ কুয়েতে শ্রমিক পাঠানোও বন্ধ করে দেয়। এতে নড়েচড়ে বসে কুয়েত সরকার। তদন্তে দেখা যায়, ছোটখাটো প্রকল্পের জন্য কুয়েত সরকারের ইস্যু করা ১৮ ক্যাটাগরির ভিসা প্রতিটি ১৫০০ কেডিতে বিক্রি হচ্ছিল এদের মাধমে। কুয়েতি আদালতে এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে যথেষ্ট সতর্ক ও তৎপর অবস্থায় ছিল কুয়েতস্থ মিশর দূতাবাস ।

কুয়েতে ভিসা কেনা-বেচা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্দয়-আদম ব্যাপারিদের প্ররোচনায় পড়ে অনেক প্রবাসী নিজের স্বজন-বন্ধুদের জন্য ভিসা ক্রয় করে থাকে। কিন্তু অতি উচ্চমূল্যে এসব ভিসা বিক্রির বিপরীতে হৃদয় এবং বিবেকহীন আদমব্যাপারিরা বাস্তবে কোনো কাজের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় মুখে এটা সেটা বলে এবং ভূয়া কাগজ দিয়ে ভিসা ক্রেতাকে বুঝ দেয় যে চাকরি নিশ্চিত, কিন্তু পরে দেখা যায় তাদের ওই চাকরি আসলে অস্থায়ী, মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য। এরপরই তাদের বের করে দেওয়া হয়- তখন বাড়িতে টাকা পাঠানো দূরের কথা, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হন্যে হয়ে খুঁজতে হয় চাকরি। অনেক সময়ে অস্থায়ী চাকরিও থাকে না। তখন, প্লেন থেকে নামার পর থেকেই তাকে খুঁজতে হয় চাকরি। কিন্তু কাগজ-পত্রে অবৈধ হওয়ায় সেটাও সম্ভব হয় না।

কুয়েতে সমুদ্র সৈকত এলাকার বিখ্যাত এক আরব ফাস্টফুডের দোকানের কর্মচারী শেখ কামলুদ্দিন রাসেল আরব টাইমসে বুধবার প্রকাশিত খবরটিতে ইঙ্গিত করে বললেন, শত শত বাংলাদেশি কুয়েতসহ অন্যত্র এমন বিপদে পড়ছেন হর হামেশা। জমি বেঁচে, ঋণ করে মহামূল্য ভিসা কিনে বিদেশের মাটিতে গিয়ে অজানা পরিবেশে, ভাষা না জানা একটি দেশে একজন লোক চরম অসহায় হয়ে পড়ে। এ ধরনের লোকদের অনেকে সুযোগ বুঝে অতি নিম্ন মজুরিতে খাটিয়ে নেয় বছরের পর বছর। এদের কেউ কেউ আবার নিরূপায় হয়ে অপরাধ কর্মেও জড়িয়ে পড়ে। এধরনের পরিস্থিতিতে বেশি পড়ে বাংলাদেশি সহজ-সরল মানুষগুলো।

এদিকে, কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, কুয়েত সরকার বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশীয় অবৈধ ভিসা ব্যসায়ীদের বিরুদ্ধে যে কোনো সময়ে অ্যাকশনে যেতে পারে। এ বিষয়ে তাদের হাতে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। গত বছর এ ধরনের এক তালিকায় ২৯০০ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালায় যাতে বাংলাদেশ, নেপাল, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের কিছু দুর্নীতিবাজ প্রবাসীর নাম রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশি কয়েকজন জনশক্তি ব্যবসায়ী, নামধারী সাংবাদিক, দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্মী ও সাধারণ প্রবাসী রয়েছে।

একটি পাঁচ তারকা হোটেলর জিমনেশিয়ামে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার, দূতাবাস এবং যারা বিদেশে এভাবে আসছে- সবার সচেতন হওয়া জরুরি। দূতাবাসের কিছু কর্মচারী (যাদের মধ্যে মন্দুব নামের কর্মচারীরা অন্যতম) বাইরের কিছু আদম ব্যাপারীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, মিশরিরা যেখানে অবৈধ পন্থায় ভিসা কিনছে বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই থেকে চার লাখ টাকায়- বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সেই একই অবৈধ ভিসা কিনতে হলেও লাগে ছয়/সাত লাখ টাকা। এক্ষেত্রেও চলছে চরম নৈরাজ্য। দুর্বৃত্তায়নের কোনো সীমা নেই যেন বাংলাদেশিদের ঠকানোর ক্ষেত্রে।

তিনি আরো বলেন, একইসঙ্গে মিডিয়াকেও এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকভাবে। কোনো পক্ষের দালালি না করে, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজে লাগে, তাদের বিপদের বোঝা লাঘব হয়- সে ধরনের রিপোর্ট করতে হবে। প্রবাসীদের কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরতে হবে যাতে সরকার এবং দূতাবাসের সৎ ও ইমানদার কর্মচারীরা এসব প্রতিরোধে তৎপর হতে পারেন। তবে যারা বিদেশে আসছেন, তাদেরও সচেতন হতে হবে, হতে হবে স্মার্ট, যাতে আদম ব্যাপারী ও তাদের দালালরা সহজে বোকা বানাতে না পারে আপনাকে।

প্রবাসখবর.কম/আরকে

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর