বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮   ২৪ রমজান ১৪৪২

প্রবাস খবর
সর্বশেষ:
আপনি কি আপনার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে চান? লেখা [email protected] এ পাঠাতে পারেন।
৮৮১

কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের লজ্জাজনক ঘটনা ও একটি প্রস্তাব

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

প্রবাসী যুবকের সঙ্গে দুর্ব্যবহাররত শাহিন ও কাজি জাহিদ    -আলোচিত ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

প্রবাসী যুবকের সঙ্গে দুর্ব্যবহাররত শাহিন ও কাজি জাহিদ -আলোচিত ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

গরমের সময়ে কুয়েতের মতো মরুর দেশে সকালে যখন সূর্যোদয় হয়- তখনি তাপমাত্রা থাকে ৫০ ডিগ্রির এপাশ-ওপাশ। এমনি চরম গরমে গত ২ সেপ্টেম্বর অনেক প্রবাসী দাঁড়িয়েছিলেন জনবিরল গাছপালাহীন মেসিলায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের বাইরে। তারা বিভিন্ন জনে বিভিন্ন কাজ নিয়ে গেছেন। একপর্যায়ে গরমে অতীষ্ঠ হয়ে একজন নিজদেশের দূতাবাস ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলেন- এক গ্লাস পানি খাওয়ার আশায়। কারণ, অমন গরমে দাঁড়িয়ে থেকে প্রায় সবারই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ভেতরে সেন্ট্রাল এসির আরামদায়ক ঠাণ্ডায় বসে আমাদের দূতাবাস কর্মীরা এটা কখনোই বোঝেন না।  

এরপর ঘটে অবিশ্বাস্য কাণ্ড। রাস্তার কুকুর ঘরে ঢুকে গেলে যে আচরণ করা হয়, তেমনি তার সঙ্গে শুরু করে দেন ভেতরের এক লোক। সিভিল পোশাকে থাকা দূতাবাসের ওই লোক আগন্তক নিজদেশি যুবককে ক্রমাগত ধমকাতে থাকেন। একপর্যায়ে তার হাতে থাকা কাগজপত্র ও মোবাইল ফোনটা কেড়ে নেন এই অভিযোগে যে ওই যুবক তার ছবি তুলেছে। কিন্তু এই ঘটনার ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যায় যে আগন্তুক যুবক কোনো ছবি তোলেননি তার। এ নিয়ে তিনি বারবার চ্যালেঞ্জ করছিলেন যে আমার মোবাইলে আপনার ছবি তোলা থাকলে দেখান। কিন্তু তিনি তার জবাব না দিয়ে ওই যুবককে দূর দূর করছিলেন। এসময় ধমকওয়ালার সঙ্গে এসে যোগ দেন দাঁড়িওয়ালা বিশালদেহী আরেকজন। তারা প্রবাসী শ্রমিককে চড় মারতে চান। 

যাদের সেবায় বিদেশে নিজ দেশের দূতাবাস খোলা হয়েছে, যাদের টাকায় চলে তার খরচ, সেই প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয় বাংলাদেশ দূতাবাসে তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই ভিডিও। নিজদেশের দূতাবাসে প্রবাসী শ্রমিককে অপদস্থকরণ আর নির্যাতনের এই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্যাতনকারী ওই দূতাবাস কর্মচারী (তার নাম শাহিন বলে জানা গেছে) প্রতিদিনই দূতাবাসে আসা সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেন। প্রবাসীরা অভিযোগ করেছেন, ওই ব্যক্তি দূতাবাসের একজন সিকিউরিটি গার্ড। সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে তার বাইরে ডিউটি দেওয়ার কথা। তা না করে তিনি ফুলবাবু সেজে সিভিল পোশাকে অফিসের ভেতরে থাকেন। ওদিকে বাইরে প্রবাসীরা সেবার জন্য এসে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকেন। তারা দূতাবাসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও সেখানে তাদের দেখা যায় না। প্রবাসী যুবককে অপদস্থকরণে তার সঙ্গে যোগ দেয়া অপর ব্যক্তি (যার নাম কাজি জাহিদ) সম্পর্কে জানা গেছে যে তিনি হচ্ছেন দূতাবাসের একজন ক্লিনার। কিন্তু তিনিও পরিচ্ছন্নতার কাজে না থেকে সারাক্ষণ বাবু সেজে দূতাবাসে আসা প্রবাসীদের সঙ্গে গুণ্ডামি আর অবৈধ ধান্ধা করে বেড়ান।  

প্রসঙ্গত, এর আগে, গত জানুয়ারি মাসে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে প্রবাসী শ্রমিকরা কুয়েত দূতাবাসে ভাঙচুর করেছিল। তারও পূর্বে প্রায় দুই দশক আগে প্রবাসী শ্রমিকরা একবার প্রচণ্ড ক্ষোভে কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা চালিয়েছিল।  এর জের ধরে পরবর্তীতে বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণ মারাত্মক জটিলতায় পড়ে। যার জের এখনও চলছে।   

এদিকে, গত ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনার ভিডিও দূতাবাসে কাজ করাতে আসা অপর এক প্রবাসী তার মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। ধারণ করা ওই ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের নিচতলায় নামাজ পড়ার স্থানের পাশে কাগজপত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রবাসীকে সেখানে প্রবেশের অপরাধে ধমকাচ্ছেন দূতাবাসের ওই কর্মচারী শাহিন। ধমকাধমকির একপর্যায়ে তার হাতের কাগজপত্র কেড়ে নেন তিনি। মুহূর্তেই মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয় ছবি তোলার মিথ্যা অভিযোগে। আপনি থেকে তুমি এরপর তুইতে নেমে আসে তার সম্বোধন। তার সঙ্গে যোগ দেয় ক্লিনার পদমর্যাদার গুণ্ডা টাইপের একজন, কাজি জাহিদ যার নাম। 

এবার ওই যুবককে চড় মারতে চায় তারা। বের হয়ে যেতে হুঙ্কার দিতে থাকেন সেই কর্মচারী। তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে নিয়ে আসা হয় দূতাবাসের বারান্দায়। সেখানে কয়েক দফায় মারতে উদ্যত হওয়া দূতাবাস কর্মচারী পরে তাকে ধরে নিয়ে যায় নিচতলার আরেক কর্মকর্তার কক্ষে। সেখানে তার ‘অপরাধের’ জন্য বিচারসভা শুরু হয়। দরজার বাইরে থেকে ভিডিওতে এ পর্যন্ত দেখা গেছে। এ অবস্থায় শেষ হয় ভিডিও ক্লিপ। ঊদ্ধত আর মাথাগরম দূতাবাস কর্মচারীদের এমন ন্যাক্কারজনক আচরণের ভিডিও ধারণ করা প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পানি খেতে ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন সেই যুবক। কিন্তু দেখেন বাংলাদেশ দূতাবাসের অবস্থা।  

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের হেড অব চ্যান্সারি আনিসুজ্জামান জানান, ‘দূতাবাসের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কিন্তু প্রবাসীরা অভিযোগ করেন, ওই সিকিউরিটি গার্ড আর ক্লিানার ছাড়াও অন্যরা জড়িত আছে হরদম প্রবাসীদের হয়রানি পেরেশানির পেছনে। অনেকবার অনেক অভিযোগের পরও তাদের কিছুই হয়নি। বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থা অনেক সময়ে মনে হয় ঔপনিবেশিক যুগের শাসক ব্রিটিশদের সামনে নেটভ প্রজাদের মতো। এই বিষয়ে মাননীয় রাষ্ট্রদূত, কাউন্সিলর বা অন্যরা কবে জানবেন, কবে সচেতন হবেন- তা কেউ জানে না। 

আব্দুস সবুর নামে কুয়েতের আল জাহরা এলাকাবাসী একজন প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, ‘দয়া করে আপনারা ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান এমনকি পাকিস্তানি দূতাবাসে গিয়ে দেখেন, তারা তাদের প্রবাসীর জন্য কী করে? কোনো একজন ইন্ডিয়ান সমস্যায় পড়েছে শুনলে প্রায় ক্ষেত্রেই খোদ তাদের রাষ্ট্রদূত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এজন্য কর্মক্ষেতে তাদের শ্রমিকদের মনোবল থাকে উঁচু, যে কোনো ঝামেলা হলে দূতাবাস তাদের পাশে দাঁড়ায় পাহাড়ের মতো। আর আমাদের দূতাবাস- শুধু খাই খাই…’

কুয়েতের জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থায় কর্মরত একজন প্রবাসী বাংলাদেশি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখানে আমাদের দূতাবাস ও এর কর্মচারীদের কাজটা আসলে কী, কেন তারা এখানে এসেছে, কে তাদের এখানে পাঠিয়েছে- এটা অনেক ক্ষেত্রেই বড় চিন্তার একটি বিষয়। তারা কমবেশি সবাই নিজেদের ব্যবসা, ধান্ধা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সততা, দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপালন পালন, সর্বোপরি ইমানদারি কাকে বলে তারা সম্ভবত তার কিছুই জানে না। এবং বছরের পর বছর এমন চলে আসছে। রাষ্ট্রদূত আসেন, রাষ্ট্রদূত যান- কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয় না।’ 

দূতাবাসের সামনে উপস্থিত মইনুল নামে একজন প্রবাসী বললেন, ‘যারা এখানে চাকরি নিয়ে আসেন, তাদের গোড়া খুব শক্ত থাকে। ওপরওয়ালারা তাদের কিছুই করে না। সে সূত্রে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্রসচিব বা পররাষ্ট্রমন্তী কিংবা প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী এসব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাদের নিজেদের উদ্যোগী হয়ে এসব বিষয় উদঘাটন করা উচিৎ। নইলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে উপসাগরের বিভিন্ন দেশে বাংলদেশি শ্রমিকদের জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এসব ঘটনা ব্যাপক ইমেজ সংকট তৈরি করছে বাংলাদেশের জন্য।’ 

মিজান রহমান নামে কুয়েতসিটির বাসিন্দা অপর এক বাংলাদেশি বলেন, ‘সব সমস্যা তো দেশের প্রধানমন্ত্রীরই সমাধান করতে হয়। এই ঘটনাও জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনতে হবে। তহালে যদি কিছু হয়।’

সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান কি
এই ঘটনায় জড়িত প্রকাশ্য দুইজন এবং অপ্রকাশ্যদের বিরুদ্ধে এবার শক্ত ব্যবস্থা নেবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদশে সরকার- এই আশা প্রবাসীরা করছেন।  তবে  মেসিলায় বাংলাদেশ দূতাবাস ভবনের সামনে জরুরি ভিত্তিতে একটি কার পার্কি শেড নির্মাণ করা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে।   কারণ, আগের দূতাবাসটি ছিল খালদিয়া এলাকায় যেখানে জনবসতি, বাড়িঘর, দোকানপাট ছিল।   গত আগস্ট থেকে মেসিলায় নতুন ভবনে দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, কিন্তু  এখানে নেই কোনো ছায়া যেখানে অপেক্ষমান লোকজন দাঁড়াতে পারে (যদিও দূতাবাসের ভেতরে বিশাল লবিতে তাদের বসতে দেয়ার ব্যবস্থা করা যায় বলে অনেক মত প্রকাশ করেছে)।  সমুদ্রের কাছে বলে গরমের মৌসুমে বাতাসে প্রচুর আদ্রতা থাকে।   পাসপোর্ট, ভিসা, জন্মসনদ ইত্যাদি কাজে আসা প্রবাসী বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকরা ওই রোদ আর আদ্রতায় অস্থিতর হয়ে পড়েন।   তাই গাড়ির রাখার শেড একটু বড় করে নির্মাণ করলে সেখানেও তারা বসতে পারেন।   একই সঙ্গে তাদের পানি খাওয়ার ব্যভস্থা করতে হবে।   এজন্য গোটা দুই/তিন ওয়াটার কুলারের ব্যবস্থা করা যায় একপাশে।   এমন করা গেলে দূতাবাসে শাহিন-জাহিদের মতো কর্মী থাকা সত্ত্বেও অনাকাঙ্খিত অনেক ঘটনাই এড়ানো যাবে।  প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকেই এই বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করেছেন রাষ্ট্রদূত মহোদয়কে।   
প্রবাসখবর.কম/এফএনএস
 

প্রবাস খবর
এই বিভাগের আরো খবর